সমাজতান্ত্রিক সমাজ পুঁজিবাদী সমাজের চেয়ে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক

Ela
Ela
23 Min Read

(মেক্সিকান সাপ্তাহিক সিয়েম্প্রে’র ডিরেক্টর বিয়েট্রিজ পেজেস রেবোলারের কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রোর এই সাক্ষাৎকারটি নেন। এটি সিয়েম্প্রে’তে ৩০ মে, ১৯৯১ প্রকাশিত হয় এক্সক্লুসিভ সংবাদ হিসেবে। সাক্ষাৎকারের তারিখ ও স্থান জানা যায় নি।

ফিদেল বলছেন, ‘এখানে সমাজতন্ত্রের পরাজয় নিয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু আফ্রিকা, এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকায় পুঁজিবাদের সাফল্য কোথায়?’ ফিদেল কাস্ত্রো সিয়েম্প্রে’কে বলেন- ‘বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে কিভাবে পূর্ব ইউরোপ কোনধরণের উন্নয়ন পর্যালোচনা ছাড়াই একজন মানুষের মতাদর্শের জন্য তাঁর ওপর মৃত্যুর পরোয়ানা জারি করতে পারে।‘ ফিদেল বলেন- ‘এই বিশ্ব সকল মানুষ এবং রাষ্ট্রের কাছে এই প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে যে সকল সত্য এবং সর্বজনীন যুক্তি একমাত্র পশ্চিমেই নিহিত। এই প্রোপাগান্ডায় বলা হয়- ‘সমাজতন্ত্র নিহত হয়েছে, এই প্রবাদ দিয়ে পুঁজিবাদের জয়জয়কার করা হয়।‘ ফিদেল আরো বলেন- ‘এই জয়জয়কার কোথায় থাকে যখন এরাই ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, যুদ্ধসৃষ্টি করছে এবং বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করায় মত্ত হয়ে উঠছে?’

কিউবার রাষ্ট্রপতি সমাজতন্ত্রের নীতিগুলোকে সচেতনভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, তিনি এই পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করছেন যেনো ‘কাস্ত্রো এবং কিউবা ভুল’ এটা প্রমাণ করা হয়। তিনি বলছেন- অন্যের ত্রুটিপূর্ণ সিস্টেমকে ভাঙার দায়ে ফিদেল অভিযুক্ত। কেননা প্রথমবারই এমন ঘটেছে যে- ফরিয়াদীরা অভিযুক্ত হয়েছে ও অভিযুক্তরাই এখন ফরিয়াদী হয়েছে। ফিদেল কাস্ত্রো এই সাক্ষাৎকারে তার আন্তর্জাতিকতাবাদী আদর্শকে ব্যাখ্যা করেন সমাজতন্ত্রের টিকে থাকা ও পুঁজিবাদের নৈতিক পরাজয়কে ব্যাখ্যার মাধ্যমে।

পেজেসঃ পূর্ব ইউরোপের কম্যুনিজমের পতন, যাকে মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদের পতন হিসেবে বিবেচিত করা হয়, এরপর কি কিউবার সমাজতন্ত্র টিকে থাকতে পারবে?

কাস্ত্রোঃ আমরা বিশ্বাস করি- হ্যাঁ, আমরা টিকে থাকতে পারবো। শুধুই পারবো না আমাদের অবশ্যই টিকে থাকতে হবে। এটা আমাদের পিতৃভূমি এবং আমাদের আদর্শের প্রতি আমাদের দায়িত্ব যেখানে আমরা পরাজয়কে কখনো মেনে নেব না।

মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদের পরাজয়কে এত সুনিশ্চিতভাবে জাহির করা যায় না, কারণ মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদের সাথে ইতিমধ্যে বিশ্বের মহৎ লেনদেনগুলো হয়ে গেছে। যদিও বিরাজমান পরিস্থিতিতে এটি নানাভাবে বাধার সম্মুখীন হয়েছে তবুও পৃথিবীতে মার্ক্সবাদের অনন্য অবদান রয়েছে কারণ এটি প্রায় ৮০ বছর ধরে বিপ্লবী আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে। মার্কসবাদ ১০০ বছর আগ থেকে বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করা শুরু করেছে এবং লেনিনবাদ প্রায় ৮০ বছর পূর্ব থেকে। লেনিন এই সমগ্র শতাব্দী জুড়ে বিশাল প্রভাব ফেলেছে।

সর্বপ্রথমে বলতে হয়, অক্টোবর বিপ্লব এইসকল ধারণা থেকেই উৎসারিত। এটা এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অগ্রগতি যার মাধ্যমে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরী হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক উন্নয়নের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলেছিলো কারণ পুঁজিবাদী বিশ্বকে সামাজিক বিপ্লবের ভয় তাড়া করে ফিরছিলো। কোন ধরনের উদারতা বা মহত্ব থেকে নয়, বরং বিপ্লব এড়াতে তারা সচেতন হয়ে উঠছিলো। এমতাবস্থায় পুঁজিবাদ তার পতন ঠেকাতে নতুন নতুন তত্ত্ব এবং পদ্ধতি তৈরী করতে থাকলো। মানবজাতির প্রতি সমাজতন্ত্রের একটি বড় অবদান হলো ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করা । এই সমাজতন্ত্র মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ধারনা দ্বারা অনুপ্রাণিত যা শ্রমিক আন্দোলনকে প্রভাবিত করে অন্যান্য দাবির পাশাপাশি তাদের যোগ্য সামাজিক এবং বেতনের দাবি আদায়ের লড়াইয়ের কথা বলে, এই লড়াই পুরাতন উপনিবেশ ও উপনিবেশবাদের মুক্তির জন্য আন্দোলনের কথা বলে। এই মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদ পৃথিবীর সকল মহাদেশকে মুক্তির জন্য সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে।  এজন্যই মার্কসবাদ- লেনিনবাদ আমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। যে পৃথিবীতে আমরা বসবাস করি সেখানে যত কঠিন বাস্তবতা আছে সেগুলোর ব্যাপারে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে এই মতবাদ। কারণ মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদ ছাড়া, এই পৃথিবীর সুসঙ্গত ব্যাখ্যা পাওয়া অসম্ভব। আমরা মানুষ হিসেবে, জাতি হিসেবে তাদের এ ধারণার প্রতি কৃতজ্ঞ।

পেজেসঃ তারমানে এই পৃথিবী সমাজতন্ত্রের মৃত্যুর সনদে এখনো স্বাক্ষর করেনি?

কাস্ত্রোঃ সমাজতন্ত্রের ঘণ্টাধ্বনির মূল্য এখনো আছে। কেউ এটা বলতে পারবে না যে সমাজতন্ত্রের এবং সমাজতন্ত্রী, মার্ক্সবাদী-লেলিনবাদী মতবাদের বিদায়ঘন্টা বেজেছে, কারণ যখন বুর্জোয়াদের ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদী বিপ্লব এ সংঘটিত হলো, তখন সেদেশে সামন্ততান্ত্রিক রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। তখন কিন্তু বিশ্বে প্রতিক্রিয়ার একটা বিশাল ঢেউ ওঠে এবং ‘ঐড়ষু অষষরধহপব’-এর জন্ম হয়, যা পরবর্তী কয়েক দশক পুরো পৃথিবীতে আধিপত্য বজায় রেখেছিলো। কিন্তু, সেই বিপ্লবের বুর্জোয়া উদারনৈতিক যে আদর্শ ছিলো, তার চূড়ান্ত সাফল্যকে প্রতিহত করা সম্ভব ছিলো না। তারমানে কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে না যে মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদ এবং সমাজতন্ত্র সম্পূর্ণ পরাজিত হয়ে গেছে। আমরা ভুলতে পারবো না সেই ১.২ বিলিয়ন চীনের জনগণকে, যারা এখনো সমাজতন্ত্রের ছায়াতলে বসবাস করছে। চাইনিজরা প্রায় একশ বছর ধরে বিভিন্ন দুর্বিপাক ও ক্ষুধায় ভুগেছে এবং একমাত্র সমাজতন্ত্রই মিরাকলের মাধ্যমে এই দেশকে এসব থেকে মুক্তি দিয়েছে। বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের ফলাফলের ধারণা থেকে পুরো বিশ্ব এখনো দূরে আছে। পুঁজিবাদের মাধ্যমে এই পৃথিবীতে ৪ মিলিয়ন মানুষ সৃষ্টি হয়েছে যারা সর্বোচ্চ দারিদ্র্য, ক্ষুধা, পশ্চাদপদতা এবং অনুন্নয়নের মধ্যে বসবাস করছে। পুঁজিবাদ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে আমরাও এগুলোই পেয়েছি। এগুলোর মধ্যে থেকেও কি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক মতবাদের পতন নিয়ে কেউ কথা বলতে পারে?

পেজেসঃ আপনি কি বলতে চাইছেন- সমাজতন্ত্রের পতন নিয়ে কথা না বলে একটি উন্নত সমাজতন্ত্র নিয়ে মানুষের কথা বলা উচিত?

কাস্ত্রোঃ আমি বলতে চাইছি যে বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সমাজতন্ত্রের অনেক ধরনের ব্যাখ্যা এবং বাস্তবায়ন ভবিষ্যত পৃথিবীকে দেখতে হবে।

আমি মনে করি না যে সমাজতন্ত্রের দুটো ভিন্ন ধরণ হুবহু একরকম হতে হবে। আমি সমাজতন্ত্র বলতে এর মর্মকথা‘সত্যিকারের সমতা’ বোঝাচ্ছি। ফরাসি বিপ্লব বলেছিল সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং স্বাধীনতার কথা, কিন্তু সেখানে কোনো ভ্রাতৃত্ব থাকতে পারে না কারণ পুঁজিবাদী সমাজ ভ্রাতৃসুলভ সমাজ নয়। তারা ব্যক্তিবাদ দ্বারা পরিচালিত এবং সমাজ ‘শোষক ও শোষিত’, ‘লাখপতি ও ভিক্ষুক’ দ্বারা বিভক্ত, সমতার ওপর ভিত্তি করে নয়, এবং এটা একটি আদর্শ সমাজ নয়। এই ধরণের পরিস্থিতিতে আমরা  ‘সত্যিকারের স্বাধীনতা’ নিয়ে কথা বলতে পারি না। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক ধারণা, মৌলিক সমাজতান্ত্রিক ধারণা, মানুষের সংহতি, ভ্রাতৃত্ব, সমতা ও ন্যায়বিচার এই সকল ধারণাগুলো ভিন্ন ভিন্ন দেশে পরিস্থিতির বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে দেখা দিতে পারে। আমি বলব না  যে সমাজতন্ত্রের কোন দুই ধরণকে একই রকম হতে হবে। এক ধরণের সমাজতন্ত্র দিয়ে আরেকটি দেশের সমাজতন্ত্রকে একইরকমভাবে দেখবার চেষ্টা ভুল হবে। দুইজন ব্যক্তিকে অভিন্নভাবে দেখলে যেমন ভুল হবে, সেভাবে সমাজতন্ত্রের দুটি রূপকে অভিন্ন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তবে সমাজতন্ত্রের মৌলিক ধারনা অবধারিতভাবে জিতবে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো, বিশেষ করে অনুন্নত দেশগুলো এই উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারণাকে কখনোই ত্যাগ করতে পারবে না।

ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরণের সমাজতন্ত্র থাকবে, বিভিন্ন ফর্মের সমাজতন্ত্র থাকবে কিন্তু আদতে সমাজতন্ত্র থাকবে। যে সকল কারনের জন্য আজ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলো এখন আরো ক্রিয়াশীল এবং বেশিরভাগ মানুষ এ কারণগুলোর দ্বারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

পেজেসঃ যদি সমাজতন্ত্র আসে এবং এর মৌলিক ধারণাগুলো ব্যর্থ না হয় এবং মানুষের মর্যাদার জন্যই কাজ করে সেক্ষেত্রে আসলে কে ব্যর্থ হচ্ছে? কোনো মানুষ অথবা রাষ্ট্রপ্রধান?

কাস্ত্রোঃ কখনো এটি মানুষ, কখনো এটি কম্যুনিটি এবং কখনো এটি পুরো দেশ।

পূর্ব ইউরোপে যা ঘটেছিলো তার ওপর ভিত্তি করে আমি বলতে চাই- আমাদের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত যে আমাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও বিভিন্ন ঘটনাবলীর ফলাফল হিসেবে সমাজতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিলো। ঐসকল দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র আমদানী করা হয়েছিলো, এটা স্বতঃফুর্তভাবে আবির্ভুত হয় নি। কিন্তু এটা সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে খাটে না, যেখানে সমাজতন্ত্র ছিলো একটি স্বতঃফুর্ত সৃষ্টি। এটা চীন অথবা ভিয়েতনাম অথবা কিউবার ক্ষেত্রেও খাটে না। সমাজতন্ত্র এসব দেশে রপ্তানী হয় নি। আমরা সমাজতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছি আমাদের নিজস্ব বিপ্লবী চেষ্টার মাধ্যমে। এইসকল ঐতিহাসিক বিষয়গুলো হিসাব করতে হবে। মানুষের ভুলগুলোও কখনো বড় প্রভাব তৈরি করে। যে পদ্ধতিতে মানুষ চিন্তাভাবনা বাস্তবায়িত করে, কিংবা বিভিন্ন দেশের ভিন্ন রকম বিকাশের মাত্রা অথবাপূর্ব ইউরোপের এইসকল দেশের সাথে উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বের প্রযুক্তিগত পার্থক্য এই সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে- সমাজতন্ত্র ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পশ্চাতপদ এবং গরীব দেশগুলোতে, যেখানে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি রয়েছে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।  সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২৫ বছরের কম সময়ের মধ্যে দুবার ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিলো; অন্যদিকে পশ্চিমারা,  বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর স্বর্ণ, সম্পদ এবং প্রযুক্তি গোপনে মজুদ করে রেখেছিলো এবং তাদের একটি উন্নত ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর ছিলো, ফলে তারা যুদ্ধে কিছুই হারায়নি। এই সকল বিষয়গুলো সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদকে যুদ্ধ করতে সাহায্য করেছে। এখানে আরো কিছু বিষয় আছে। এখানে অবরোধ এবং বিচ্ছিন্নকরণ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। এইসকল পদক্ষেপগুলো সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে গ্রহণ করা হয়েছিলো। এইসকল অবরোধ আর সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতাই সমাজতান্ত্রিক ক্যাম্পগুলোকে পতনে বাধ্য করেছে- আমাদেরকে এটা মেনে নিতে হবে। আমাদেরকে পশ্চিমের অর্থনৈতিক শক্তিকে বিবেচনায় নিতে হবে। এইসকল ফ্যাক্টরগুলোর অনেক  গুরুত্বপূর্ণ হলো।

সমাজতন্ত্রের পরাজয় নিয়ে একধরনের কথা হচ্ছে। আচ্ছা আফ্রিকা, এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার পুঁজিবাদের সাফল্য কোথায় বলতে পারবেন? মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ যেখানে বাস করছে সেই জায়গায় পুঁজিবাদের সাফল্য ঠিক কোথায়? আমি বিশ্বাস করি যেসব অল্প কিছু দেশে এখন সমাজতন্ত্রের পরাজয় নিয়ে কথা হচ্ছে সেসকল মানুষদের পুঁজিবাদের পরাজয় নিয়ে কথা বলা উচিত। পুঁজিবাদ একশর ওপর বেশি দেশে অকার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আমি বুঝতে পারি না এটা কেনো ভুলে যাওয়া হচ্ছে। পূর্ব ইউরোপে ঘটে যাওয়া ঘটনার ওপর নির্ভর করে একটি কথা চালু হয়েছে যে সমাজতন্ত্র পরাজিত হয়েছে। আসলে পুঁজিবাদ এই পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটা নদী, সমুদ্র এবং বায়ুমন্ডলকে দূষিত করছে, এটা ওজনস্তরকে ধ্বংস করছে এবং এটা অত্যন্ত দুর্দশাজনকভাবে পৃথিবীর জলবায়ুকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে।

পেজেসঃ আপনি ঠিক বলেছেন। পুঁজিবাদের কোন নৈতিক জয় নেই। কিন্তু এটি আধিপত্যের এবং প্রযুক্তিগতভাবে ও সামরিকভাবে একটি সিস্টেম হিসেবে জয় লাভ করেছে। এগুলোর ভেতর এর ক্ষমতা নিহিত আছে।

কাস্ত্রোঃ হ্যা, এই সময়ে সবচেয়ে আধিপত্যশীল ব্যবস্থা হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। পুঁজিবাদ একশ বছরের পুরানো, এবং কিছু পুঁজিবাদী বৈশিষ্ট্য হাজার বছর ধরেই বিদ্যমান আছে। আধুনিক চিন্তাধারা থেকে বলা যায় পুঁজিবাদের প্রচুর অভিজ্ঞতা এবং প্রচুর শক্তি আছে।

সামাজিক ব্যবস্থা পরিবর্তন সহজ কাজ নয়। প্রাচীনকালে দাসপ্রথা চালু ছিলো। এটা কত সময় টিকে ছিলো? আমরা যদি রোমান অথবা গ্রীক ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, হোমার নামের একজনের লেখা থেকে পাওয়া যায়, ইলিয়ডের সময় থেকে ঠিক কত শতক পর্যন্ত সেই ব্যবস্থা টিকে ছিলো? এবং দাসপ্রথার পর সামন্তবাদী ব্যবস্থার আবির্ভাব হলো, যে সময়টাকে তথাকথিত মধ্যযুগ বলা হয়, সেটা কতসময় টিকে ছিলো? এরপর পুঁজিবাদের আবির্ভাব ঘটে। কোন ব্যবস্থাই চিরস্থায়ী নয়, পুঁজিবাদকে চিরস্থায়ী বলবার ভিত্তি কি? শুধুমাত্র একটি নতুন সামাজিক ব্যবস্থার অবনতির জন্য এ কথা বলা যায়?

পুঁজিবাদী আধিপত্য কিন্তু অদৃশ্য নয়। প্রথমে পুঁজিবাদী আধিপত্য এবং পরে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য দীর্ঘসময় ধরে টিকে আছে। এর আধুনিক ধারণা থেকে এটা বলা হয়ে থাকে যে প্রথম সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং স্পেনের মধ্যে সংগঠিত হয়েছিলো কিউবাকে কেন্দ্র করে। সাম্রাজ্যবাদ প্রায় ১০০ বছর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

পেজেসঃ আপনি বলছেন যে এই কথার কোন ভিত্তি নেই যে পুঁজিবাদ চিরকাল ধরে টিকে থাকবে, ঠিক আছে। কিন্তু আমাকে এটা বলতে হচ্ছে যে, তাদের সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আধিপত্য করার মতো যথেষ্ট অস্ত্রসম্ভার আছে।

কাস্ত্রোঃ বিশ্বের বিভিন্ন অংশের ওপর কিছুসময়ের জন্য আধিপত্য বিস্তার করবার মত প্রযুক্তি পুঁজিবাদের আছে।  আমরা একথা বলতে পারবো না যে এটাই চিরকাল ধরে ঘটবে। এমনটা ঘটবার কোন সম্ভাবনাই নেই যে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের নানা বয়ানে, যেমন বুশও আছে এর মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ের যে প্রমাণ সামনে এনেছে তাশুনেই আমরা পটে যাবো। তারা ‘নতুন এক যুগ, ‘এক যুক্তরাষ্ট্রের যুগ, ‘১০০০ বছরের যুগের আশার কথা শোনাতে চেয়েছে যা এইবারই প্রথম বলা হয়নি। থার্ড রাইখ খুব বেশিদিন টেকেনি, যেখানে নাৎসী জার্মানরা ১০০০ বছরের শাসনকালের কথা বলেছিলো।

এগুলো হচ্ছে বিভ্রম যা তারা মনে মনে পোষণ করে এবং তারা ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে গেছে। মানবজাতির ভেতর এমন কোন মানুষ নেই, যাকে তার আশা ও স্বপ্ন থেকে জোর করে আত্মসমর্পন করানো যায়। ৩০ বছরের বিপ্লবে, আমাদের নানাভাবে হুমকি দেয়া হয়েছে, আক্রমন করা হয়েছে, চাপ দেয়া এবং সবরকম উপায়ে লাঞ্ছিত করা হয়েছে এবং আমরা এগুলো প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছি এবং নিজেরা ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীন থেকেছি। আমি বিশ্বাস করি এটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে মানুষ কীভাবে কোনকিছু অর্জন করতে পারে।  

পেজেসঃ পুঁজিবাদ তার বর্তমান অবয়ব নিয়ে কতদিন টিকে থাকবে বলে আপনি বিশ্বাস করেন? আপনি একে কতদিন সময় দেবেন?

কাস্ত্রোঃ কেউ এই প্রশ্নের সৎ উত্তর দিতে পারবে না। কেউ জানে না ঠিক কতদিন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং সাম্রাজ্যবাদ টিকে থাকবে। 

সাধারনভাবে বলা যায়, বিপ্লবীরা তখনই পথভ্রষ্ট হবে যখন সে সময় গণনা শুরু করবে। ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে প্রায় প্রত্যেক বিপ্লবী বিশ্বাস করেছিলো যে  নিকট ভবিষ্যতে তার মতবাদের জয় হবে। যারা ফরাসী বিপ্লব সংগঠিত করেছিলো তারাও চিন্তা করেছিলো তাদের বিপ্লবী পরিবর্তন খুব দ্রæত অল্প সময়ের মধ্যে হবে। যদিও সেই ধারণা বাস্তবতার মুখ দেখেছে দেরীতে। বিপ্লবীরা বিশেষ করে লেলিন একজন স্বতন্ত্র বিপ্লবী এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি বিশ্বাস করতেন রাশিয়ান বিপ্লবের পরে খুব দ্রুত বৈশ্বিক বিপ্লব সংগঠিত হবে। লেলিনের পূর্বে প্যারিসের কৃষক শ্রেণি বিশ্বাস করেছিলো যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব খুব দ্রুত ঘটবে; মার্ক্স বিশ্বাস করেছিলেন তার মতবাদের খুব দ্রুত জয় হবে। (ফাদার মিগুয়াল) হিডালগো এবং (ফাদার হোসে-মারিয়া) মরলোস বিশ্বাস করেছিলো যে মেক্সিকোর স্বাধীনতা খুব দ্রুত অর্জন করা সম্ভব। ১৮১০ সালে, সিমন বলিভার বিশ্বাস করেছিলেন লাতিন আমেরিকার মুক্তি এবং একীভবনের মধ্য দিয়ে ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা আসন্ন। তা সত্তেও, অনেক বছরের কঠিন পরিশ্রমের পরে দেশে দেশে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং ‘একীভবনপ্রক্রিয়া’ এখন পর্যন্ত বাস্তবসম্মত নয়। ১৮৬৮ সালে কিউবানরা বিশ্বাস করেছিলো তাদের যুদ্ধের সাফল্য খুব দ্রুত আসবে। অথচ, ত্রিশ বছরের ভেতর তারা নব্যঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্রের ভেতর ঢুকে পড়ে। এই নব্যঔপনিবেশিক শাসনতন্ত্র কিউবান বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত আমাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক আধিপত্যের অধীনে প্রায় ৬০ বছরের জন্য অধীনস্ত করে ফেলে।

আমি বলতে চাই যে খ্রিস্টানরা প্রথমে বিশ্বাস করতো যে তাদের মতবাদ সারা পৃথিবীতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, যদিও এটি জার্মান জনগনের ধর্ম হয়ে ওঠার পূর্বেই অনেক শতক পার হয়ে গেছে। সাধারনভাবে, বিপ্লবীরা সবসময় বিশ্বাস করে তাদের ইচ্ছা তাদের ধারণা যা তারা ধারণ করে, খুব দ্রুত তার জয় হবে। আমরা বিপ্লবীরা পুঁজিবাদী বিশ্বে আমাদের চিন্তাধারা, আমাদের কল্পনাকে সাথে নিয়ে একধরনের ঝুঁকির ভেতর দিয়ে দৌড়াচ্ছি। আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে একদিন এই স্বার্থপর এবং নির্দয় শাসনতন্ত্রের পতন হবে। আমি এটা বিশ্বাস করি কারণ আমি মানববাদে বিশ্বাস করি, আমি মনুষ্যজাতিতে বিশ্বাস করি, তার সংগ্রাম করবার সামর্থ্যকে বিশ্বাস করি, আরো ভালো করে বললে ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি।

নতুন বিস্ময় ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে। আমি বিশ্বাস করি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গুরুরা খুব কাছ থেকে দেখতে পাবে কিভাবে বিভিন্ন ঘটনার বিকাশ ঘটবে এবং বড় বড় অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কি কি ধরনের দ্বন্দের সৃষ্টি হবে, আরো ভালোভাবে বলতে গেলে সামনের কয়েক বছর কিংবা সামনের কয়েক দশকেই এই ঘটনাগুলোর এক ধরনের বিকাশ ঘটবে। এটা নিশ্চিত যে, বর্তমান পৃথিবী আজীবন এই রূপে চলতে পারবে না, কেননা বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ ক্ষুধা, দুঃখ-দুর্দশার মাঝে জীবন কাটানো শুরু করেছে। এই মানুষগুলোই মারা যাবে যদি না তারা এটা প্রতিহত করে।

এই পৃথিবীকে পরিবর্তিত হতেই হবে, এবং পৃথিবী পরিবর্তন হবে, কিন্তু কেউ বলতে পারে না সেটা কখন ঘটবে। পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে, মানবজাতি যদি এর দ্বারা ইকোলজিক্যাল বিপর্যয় এবং যুদ্ধের ভয়াবহতার মুখে পড়ে তাহলে পৃথিবী খুব নির্দয়ভাবে পরিবর্তিত হবে। পুঁজিবাদের সকল আগ্রহ আধিপত্য অর্জনে, তাদের উন্মাদ জীবনযাপনে এবং তাদের সমাজের মূলে রয়েছে ভোগ। 

পেজেসঃ যখন আপনি ব্রাজিলিয়ান প্রেসিডেন্ট কালোর ডি মেলোর অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তখন স্প্যানিশ প্রেসিডেন্ট ফেলিপ গনজালেস আপনাকে ‘পৃথিবীর গনতন্ত্রীকরন প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে বলেন। সেই সময়ে আপনি বলেছিলেন যে সমাজতান্ত্রিক মডেল অন্যান্য যেকোন ব্যবস্থার চেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক। আপনি কি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে আপনার সেরকম গণতন্ত্র আছে?

কাস্ত্রোঃ এটা বলা যায় না যে ফেলিপ (গনজালেস) আমাদেরকে আহবান করেছিলো লাতিন আমেরিকার গনতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য। এটা আসলে ঘটেনি, কিন্তু তারপরও আমরা দেখতে পাচ্ছি এ ধরনের চিন্তার ছাপ ইতিমধ্যে সবার মাঝে পড়েছে। ফেলিপ, আরো ভালো ভাবে বললে কার্লোস আন্দ্রেজ পেরেজ তাদের অর্থনৈতিক সমস্যা এবং আক্রমণের ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয়গুলোর প্রতি তাদের চিন্তাভাবনা আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করেছে। কিউবা এ ধরনের দুর্যোগের ভেতর দিয়ে গিয়েছিলো যা এখন পূর্ব ইউরোপে বিরাজ করছে। তারা তাদের এইসব চিন্তাই আমাদের কাছে প্রকাশ করেছিলো।

পুঁজিবাদ বলতে চায় যে আমাদের ত্যাগ স্বীকার করা উচিত কিন্তু তারা সঠিক জায়গায় এসে এটা কখনো বলে নি যে ‘কোন ধরনের চিন্তা করা প্রয়োজন’ এবং ‘আমরা কিভাবে বাঁচতে পারতাম’। ফিলিপ গনজালেস বলেছে যে সে জানে, কিউবানরা সবসময়েইলড়াইয়েরজন্য এবং শত্রুকে প্রতিরোধ করবার জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে কিউবানরা প্রস্তুত। এই মেসেজটাইতারা পেয়েছে। আসলে, আমাদের মানসিকতাই হচ্ছে যেকোন মূল্যে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, আমাদের বিপ্লব এবং আমাদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করা। আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করি। আমরা যদি ইতিহাসের ওপর আস্থা রাখি তাহলে দেখতে পাবো যে স্পেন নিজেদেরকে বীরত্বের উদাহরন হিসেবে সৃষ্টি করতে পেরেছে। ১৮০৮ সালে যখন নেপোলিয়ন স্পেনকে আক্রমণ করে, স্প্যানিশ জনগন তাদের শত্রুকে প্রতিহত করবার ক্ষেত্রে কোনধরনের দুর্বলতা দেখায় নি, এজন্য এরা ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অপ্রতিরোধ্য আর্মি হিসেবে তারা পরিচিতি পেয়েছে। একইভাবে, স্পেনের লোকজন আরবের আক্রমনকারীদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ সংগঠিত হয় সেই যুদ্ধে ৭০০ বছরেও ক্ষান্দ দেয়নি। মাদ্রিদে সমাজতন্ত্রীরা ফেলিপকে দুইবছর সমর্থন দিয়েছে ফ্র্যাংকোর শক্তির বিরুদ্ধে যেখানে ফ্র্যাংকো জার্মান প্লেন এবং ইতালীর সৈনিকদের সমর্থন করেছিলো। সমাজতন্ত্রীরা বলেছিলো-‘তারা ছেড়ে যাবে না’ এবং তারা তাদের কথা রেখেছিলো।

আজকের স্পেন প্রবল ইচ্ছাশক্তি ছাড়া টিকে থাকতে পারতো না। কোন শাসনতন্ত্র বেশি গণতান্ত্রিক- আপনার এ প্রশ্নের প্রতি সম্মান রেখে বলছি- আমি বিশ্বাস করি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক। কিন্তু ফিলিপের সাথে যখন একটা উপলক্ষে দেখা করেছিলাম এবং সেখানে কার্লোস আন্দ্রেজ পেরেজও উপস্থিত ছিলো তখন তার সাথে এ বিষয় নিয়ে কোন কথা হয় নি, ব্রাজিলে ভ্রমণকালে এটাই সবচেয়ে সত্য এবং নিরপেক্ষ গল্প।

পেজেসঃ আমাকে বলেন কমান্ডার, কেনো আপনি সমাজতান্ত্রিক মডেলকে অন্যান্য ব্যবস্থার তুলনায় অনেকবেশি গণতান্ত্রিক বলে বিশ্বাস করছেন?

কাস্ত্রোঃ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চেয়ে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই অনেকবেশি গণতান্ত্রিক, আমরা নিজেরাই আমাদের শাসক। আমাদের সমাজতন্ত্রে- আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি বলছি- এখানে প্রতি পদে পদে জনসাধারণের নিরবিচ্ছিন্ন অংশগ্রহন আছে, তা না হলে আমরা শত্রুকে প্রতিহত করতে পারতাম না।

আমি নিশ্চিত আপনি বুঝতে পেরেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্নধর্মী অবরোধ এবং হুমকিকে ত্রিশ বছর ধরে প্রতিরোধ করা সম্ভব হত না যদি না এদেশের মানুষ বিপ্লবের সকল কর্মকান্ডে অংশগ্রহন না করত।

কেবলমাত্র মানুষের অংশগ্রহনেই আমেরিকার প্রতিবেশী দেশ হয়েও এখানে সমাজতন্ত্র টিকে আছে। পশ্চিমে রাজনৈতিক পদ্ধতির যোগ্যতাকে বিবেচনা করে একজন মানুষকে সম্মান দেয়ার প্রবণতা আছে। যেমন তারা বলে- ‘কাস্ত্রোর কিউবা’, ‘কাস্ত্রোর সরকার’অথবা ‘কাস্ত্রোর কাজ’। কিন্তু কিউবার মানুষ কিউবাকে ধারন করে, কিউবার সরকারকে ধারন করে, অন্য সকল কাজকে ধারন করে।এটাই ব্যক্তির মেধার জন্য একটি রীতি যেখানে কোন লিডার থাকে না। গ্রিসের স্বর্নযুগের সময়, কিছু লিডার নিজেদের স্বর্গীয় হিসেবে আখ্যা দেয়, তখন আলেকজান্ডারকে অলিম্পিয়াসের পুত্র এবং একজন দেবতা হিসেবে দেখা হত।। কিন্তু নিজেদের স্বর্গীয় আখ্যা দেয়ার পরেও তাদেরকে সেই কাজগুলোই করতে হয়েছে যা একজন মানুষ করতে পারে। কে কিউবার সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করেছে? সশস্ত্র পুরুষ এবং নারী, শ্রমিক এবং ছাত্র, কৃষক, লক্ষ লক্ষ সশস্ত্র মানুষ কিউবার সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করেছে। একটা রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে টিকে থাকা। আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি- এইসকল তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশগুলো তখন কোথায় ছিলো? আমাদের জাতিতে গণতন্ত্রের সারাংশকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয় তা সেইসকল সমাজের সাথে মিলবে না যে সমাজে শ্রেণি দ্বারা বিভক্ত। যেখানে আপনি দেখবেন একজন পুলিশ ক্রমাগত একজন মানুষকে দমন করে যাচ্ছে।

ইউরোপ, লন্ডন কিংবা অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশে কোনধরনের চিত্র দেখা যায়? কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন কি দেখা যায়? পুলিশ ঘোড়া, কুকুর এবং পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে মানুষ দমন করতে, সেখানে শ্রমিক ধর্মঘট করে, প্রতিবেশিরা ট্যাক্সের জন্য প্রতিবাদ করে এবং তারপর তারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, লাশে পরিনত হয়। এই চিত্র প্রতিনিয়ত দেখা যায়। এখানে এসে আমরা রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ দেখতে পাই যেখানে রাষ্ট্র নিষ্পেষণের শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

আমাদের দেশে এ ধরণের ঘটনা দেখা যায় না। বিপ্লবের ত্রিশ বছরের মধ্যে আমাদের জাতি এরকম কোন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি কারণ এখানে মানুষের মধ্যে, রাষ্ট্রের মধ্যে এবং সরকারের মধ্যে একটা ঐক্য বিরাজ করে।  আমি বলতে চাই যে একজন কিউবান নাগরিক দাবী করতে পারে- ‘আমিই রাষ্ট্র’ যেভাবে লুইস চোদ্দ (ঢওঠ) বলেছিলো। কারণ সেই রাষ্ট্রে, সে অনেকের মাঝে একজন যে তার অস্ত্র দ্বারা এই রাষ্ট্রকে রক্ষা করেছে। এরকম আচরণ, এরকম পরিচিতি সমাজতন্ত্রের গনতন্ত্রের নির্যাস ছাড়া মানুষ কল্পনা করতে পারবে না। যেখানে মানুষে মানুষে নির্মম শোষণ প্রকট; যেই নির্মম শোষণ এবং অসমতা পুঁজিবাদী সমাজে প্রত্যক্ষ করা যায় সেখানে কি এধরণের গনতন্ত্র প্রত্যক্ষ করা যাবে? না, এটা সম্ভব নয়। এ কারনেই আমি বলছি যে সমাজতান্ত্রিক সমাজ পুঁজিবাদী সমাজের চেয়ে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক।

পুঁজিবাদী সমাজ এবং পুঁজিবাদী গণতন্ত্র মানুষকে উৎপীড়ন এবং শোষনের আদলে নির্মিত হয়েছে, তাদেরকে এ কারনেই তৈরী করা হয়েছিলো। অন্যদিকে সমাজতন্ত্র মানবজাতিকে রক্ষা করবার জন্য, মানবজাতিকে সমর্থন দেবার জন্য এবং একজন মানুষকে আরো বেশি মানবিক ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের পথে দৃঢ় ও যোগ্য খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলে।

পেজেসঃ কমান্ডার, তাহলে কি আমরা বলতে পারি গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের যৌক্তিক পরিণতি?

কাস্ত্রোঃ আমি যেভাবে এটাকে চিন্তা করি, গনতন্ত্রকে সমাজতন্ত্রের পরিণতি বলবার চেয়ে বলা যায় গণতন্ত্র হলো সমাজতন্ত্রের মর্মকথা বা সারবস্তু।

অনুবাদঃ ফাহমি ইলা

বইঃ প্রগতি

প্রকাশকঃ বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

Share This Article
Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *